ছোটগল্পঃ মোমো




ছোটগল্প_☘️মোমো ☘️

কলমে_ ✍️ চন্দনা ভৌমিক(মিষ্টি)


আজও অফিস থেকে ফিরতে দেরী হয়ে গেল পর্নার। এমন বসের পাল্লায় পড়েছে। জাম্বুবান একটা। সুযোগ পেলেই হলো। হন্তদন্ত হয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগোচ্ছে। উফফ কত্তো দেরী হয়ে গেলো। এর মধ্যে মায়ের ফোন এসে গেছে দুবার। মোমো খুব বায়না শুরু করেছে আজ। মামমাম এর সঙ্গেই নাকি পার্কে যেতে হবে। দিম্মা দাদান নিয়ে গেলে চলবে না। ছুটতে ছুটতে এসে কোনরকমে বাস টা পেলো। ভাগ্য নেহাৎ মন্দ নয় আজ। সিট ও পেলো তাও আবার কর্নারের। এখনও বাড়ি পৌঁছতে ১ ঘণ্টা তো লাগবেই। মিটিং মিছিলের তো কমি নেই।


 সিটে পিঠটা একটু এলিয়ে দেয় পর্না। মনে মনে ভাবতে থাকে আজ আর মোমো কে নিয়ে পার্কে যাওয়া হবে না। এখন বাড়ি গেলেই ছুট্টে এসে জড়িয়ে ধরবে। তারপর হাজার টা বায়না। এই তো সবে ক্লাস থ্রী। এর মধ্যেই জীবন চিনতে শিখে যাচ্ছে ছোট্ট মেয়েটা। ভাগ্যিস বাবা মা ছিলো। না হলে তো এক রত্তি মেয়েটাকে নিয়ে জলে পড়ে যেতো। কতো কথা চোখের ওপর ভীড় করে আসে। ভুলতে চাইলেও কি ভোলা যায় সবটা? পাঁচ বছরের সাজানো সংসার যে তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে যাবে কখনও কি ভেবেছিলো? ওদের বিয়ে টা যে লোক দেখানো সেটা বুঝতেও এতো সময় লেগে গেলো। সেদিন যদি তথাগত র অফিসে ওকে সারপ্রাইজ দিতে না যেতো তাহলে তো জানতেও পারতো না যে তার জীবনের সব চেয়ে কাছের মানুষটি অন্য কোনো ম্যাডামের বার্থডে সেলিব্রেট করার জন্য কোনো নামীদামী রিসর্টের রুম বুক করেছে। হাতে নাতে সব কিছু প্রমান পেয়েছিলো সেদিন রাতেই। কোনো প্রশ্ন উত্তরের পর্ব করেনি পর্ণা। ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে এক বস্ত্রে এসে উঠেছিলো বাপের বাড়ি। কোর্টে কয়েকদিন ছাড়া ব্যক্তিগত প্রয়োজনে একবার ও সামনে আসেনি তথাগতর। তারপর থেকে জীবন যুদ্ধ। মেয়ের দায়িত্ব তথাগত নিতে চায় নি তা নয় কিন্তু ওকে সেই সুযোগ টাও দেয়নি পর্না। চাকরী জোগাড় করা, মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানো সব সামলেছে একা হাতে। মোমো আজকাল আর তেমন ওর বাপির কথা বলে না। পুরো পৃথিবী জুড়েই শুধু মা আর মা। কোথায় তেমন সময় দিতে পারে ওকে? অভাব তো থেকেই যায়। চোখ টা বন্ধ হয়ে আসে পর্ণার। দু চার ফোঁটা মুক্ত বিন্দুও টলটল করছে। 

 

 অনেকদিন ধরে মোমো বলছে_

মামমাম  চলো না কোথাও বেড়াতে যাবো। কতোদিন কোথাও যায়নি। চলো না...

যাবো যাবো বলে ও যাওয়া হচ্ছে না। আজ মোমো খুব খুশী হয়ে যাবে। যখন জানতে পারবে মামমাম ঘুরতে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে। জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে ওকে।


কি মজা কি মজা আমরা পুরী যাবো। দাদান দিম্মা আমরা ঘুরতে যাবো। কি মজা আমরা ট্রেনে চাপবো। আচ্ছা দাদান ট্রেন টার উল্টো দিকে গাছপালা গুলো ছুটবে বলো? আমি বই তে পড়েছি। কি মজা!! কি মজা। মামমাম আমি কিন্তু আমার ডলু কে সঙ্গে নিয়ে যাবো। ওর জন্যেও একটা টিকিট লাগবে। 


" হ্যাঁ রে বাবা। তোর ডলুর টিকিট ও কেটেছি। খুশি? কি কি ড্রেস নিবি ঠিক কর। যা সাজুনি তারপর আমাকে আর দিম্মাকে পাগল করবি না।"


" মা মা আর দুদিন পরেই আমরা যাবো বলো? ওখানে গিয়ে আমাকে পড়তে বলবে না তো? আমি কিন্তু সমুদ্রে স্নান করবো..." 


" করবি মা। "


অবশেষে সেই দিন। অপেক্ষার অবসান। ক্যাব এসে গেছে। ডলুকে নিয়ে মামমাম, দিম্মা আর দাদানের সাথে বেরিয়ে পড়লো মোমো। স্টেশনে পৌছে গেছে আগেই। তখনও ট্রেন দেয় নি প্লাটফর্মে। কখন ট্রেন আসবে কখন ট্রেন আসবে করে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে মোমো। কখন ট্রেনে চাপবো? অস্থির করছে একেবারে। ট্রেনটা এলে যেনো ওরা বাঁচে। এর মধ্যে আবার চিপস, চকোলেট, ফ্রুটি,  পেস্ট্রি সব কেনাও হলো। 


" দাদান দিম্মা দেখো ট্রেন আসছে। এটাতেই চড়বো তো আমরা? "


" হ্যাঁ দিদিভাই এই ট্রেন টাতেই চড়বে তুমি। আর একটু দাঁড়াও। "


অবশেষে ট্রেনে চড়লো মোমো। চলতে শুরু করলো ট্রেন। প্রশ্নে প্রশ্নে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় তিন জনের। গাছ উল্টো দিকে ছুটছে কেনো? ট্রেনটা এতো জোরে দৌড়য় কি করে? আচ্ছা চাঁদ টাও কি আমাদের সঙ্গে পুরী যাচ্ছে? আর কতক্ষন লাগবে পৌঁছতে?

আচ্ছা মামমাম বাপি ও তো আমাদের সঙ্গে যেতে পারতো বলো? ও মামমাম কি হলো চুপ করে আছো কেনো তুমি? "


" ও দিদি ওঠুন উঠুন। টিকিট টা দিন। নামবেন তো... "


" হ্যাঁ ভাই এই নাও। "


বাস থেকে নেমে হাটতে হাটতে পর্না ভাবতে থাকে এবার সাত দিনের ছুটি নিতেই হবে ।


@ মিষ্টি ✍️

(১২/৭/২০২১)

Comments