ছোটগল্প : যাদের কথা কেউ ভাবে না




 ছোট গল্প

গল্পঃ যাদের কথা কেউ ভাবে না

কলমেঃ অরুণ বর্মন

তারিখঃ ১৩/০৭/২০২১


নিয়মিত সন্ধ্যায় বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেই।

সেদিন সন্ধ্যায় টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল তাই কেউ আসেনি। চায়ের দোকানটায় আমি একা বসেছিলাম। হঠাৎ একটি ছয় সাত বছরের ছোট্ট ছেলে এসে ভিক্ষা চাইল। গায়ে একটি ময়লা ছেঁড়া গেঞ্জি, মাথার চুল গুলো উসকোখুসকো, কালো টিনটিনে চেহারা। বললো কাকু, কয়টা টাকা দেবে? আমার মা খুব অসুস্থ।

ছেলেটাকে দেখে খুব করুণা হলো।

একা বসে আছি, তাই ভাবলাম ওর সাথে একটু গল্প করি।

 বললাম এইটুকু বয়সে ভিক্ষা করছিস কেন?

বললো আমার মা ছাড়া আর কেউ নেই। মাটা খুব অসুস্থ।

আমি বললাম তোর বাবা কি করে?

বললো বাবাকে আমি দেখিনি। মা আর আমি থাকি।

বসে বসে ওর সাথে অনেক কথা বললাম।

শেষে ওকে দশটা টাকা দিয়ে বললাম আজ তো সন্ধ্যা হয়ে গেছে, কাল বেলা এগারোটার দিকে এখানে আসিস। তোর সাথে তোর মাকে দেখতে যাব।

ছেলেটি চলে গেল, আমিও বাসায় ফিরলাম। পরদিন সকালে ছেলেটির কথা আমার মনেই নেই।

স্বাভাবিক নিয়মেই সকাল এগারোটার দিকে চায়ের দোকানে বসে আছি। হঠাৎ দেখি ছেলেটি আমার কাছে এসে বললো, "কাকু যাবেন না?" আমি একটু আশ্চর্যই হলাম। ওর মনে আছে?

যদিও সেই সন্ধ্যার আবেগ এখন আর নেই। তবু অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললাম চল্। মটর সাইকেলে ওঠ্, বলে মটরসাইকেলটা স্টার্ট দিলাম। ছেলেটা পিছনে বসলো।

চলে গেলাম বেশ দুরে তার সেই বস্তিতে। মটর সাইকেলটা বাইরে তালা দিয়ে রাখলাম।

ছেলেটা বললো চলেন কাকু। কিছুটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। তারপরও ওর সাথে ভিতরে গেলাম।

যেহেতু বর্ষা হয়েছে। ভিতরের রাস্তাটা কাদায় প্যাচপ্যাচ করছে।

চারিদিকে নোংরা ময়লা আবর্জনা, ড্রেনের গন্ধ, প্রস্রাব পায়খানার গন্ধ। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা কিলবিল করছে।

বস্তির ঘরগুলো চাঁচের বেড়া, উপরে একচালা টিন।

আমাকে ও নিয়ে গেল একদম কোণার একটি ঘরে। মাথা নিচু করে বারান্দায় ঢুকলাম। মাটির মেঝে বৃষ্টিতে স্যাতস্যাতে হয়ে গেছে। 

ছেলেটা বললো ঘরে আসেন কাকু। ঘরে ঢুকলাম। বসতে দেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। পাশের ঘর থেকে সে একটা প্লাস্টিকের টুল এনে বসতে দিল। বসে পড়লাম।


সামনে তার মা মেঝেতে একটা জীর্ণশীর্ণ মাদুরের উপর দুই পা মেলিয়ে বসে আছে। পা দুটো শতছিদ্র একটা ময়লা কাঁথা দিয়ে ঢাকা।

ঘরে ঢুকতেই ওর মা বললো, আসেন দাদা, কাল রাত থেকে ছেলেটা আপনার কথা বার বার বলছে।


আমাদের কথা আর কি শুনবেন দাদা!

বলেই কাঁথাটা সরিয়ে পাদুটো দেখালো। দেখেই আমার গা পা শিরশির করে উঠল। গায়ের লোমগুলো শিউরে কাঁটা দিয়ে উঠলো।

দেখলাম একটা পা ফুলে বিশ্রী রকমের মোটা হয়েছে। আরেকটা পা একদম পচে গেছে মনে হচ্ছে। পচে যেন জবজব করছে। সম্ভবত গ্যাংরিন হয়েছে বলে মনে হলো। 

বুকের মধ্যটা হু হু করে কেঁদে উঠলো। 

কি বলব ভেবে পাচ্ছি না।


ওর মা ততক্ষণে বলে চলেছে, আমি আর নড়তে চড়তে পারিনে। ঐ বাচ্চা ছেলেটাই সব করে।

আমি বললাম ওর বাবা!

ওর বাবা সেই কবে এখানে কাজ করতে এসেছিল। কি দে কি করে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। খোকা পেটে আসার কয়েক মাস পরেই আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করে সেই যে চলে গেল। আর কোনোদিন আসিওনি, খোঁজও নেয়নি।

খোকটা হলে কাজবাজ করে  চলেছিলাম। ইট ভাঙা, রাজমিস্ত্রীর যোগাড়ে, রাস্তার কাজ করা,পরের দোরে কাজ করা এভাবে কোনোমতে চলেছিল।

বছর খানেক হলো, পা'য় যে কী হলো। এখন আর উঠতে পারিনে। দাঁড়াতে পারিনে। এই বসেই কাটে দিন। পা'র মধ্যে শুধু জ্বালা করে। ওর মধ্যে যেন কেউ আগুন ঢেলে রেখেছে। যন্ত্রনায় ছটফট করি।

ঐ ছোট্ট ছেলেটাই সব করে। আমার খাওয়ানো, ধোয়ানো। পায়খানা, প্রস্রাব পরিষ্কার করা, রান্না বান্না সব ও করে। আর কত করবে ঐটুক ছেলে।


কোনো দোকানে থাকলেতো দিনে বিশ ত্রিশ টাকার বেশি দিতে চায়না। তাই ভিক্ষা করে। দিনে প্রায় দেড় দু' শ টাকা হয়। আমার ওষুধ, ঘরভাড়া, খাওয়া তাতে চলে কোনোমতে।

আবার কোনো কোনো দিন বিয়ে, খানা বাড়ী থেকে এঁটোঘাটা ভাত তরকারি নিয়ে আসে। এ ঘর ও ঘর থেকে পঁচা বাসি ভাত তরকারি চেয়ে আনে। তাতে দু'জনের হয়ে যায়।

হা! পোড়া কপাল আমার। মরণটাও হয় না। আমার মরণটা হলে অন্তত ছেলেটা বেঁচে যেতো।

একটানে সে-ই শুধু কথাগুলো বলে যাচ্ছে। আমি নির্বাক হয় শুধু শুনছি। কিছু বলার মতো ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।

কথাগুলো শুনতে শুনতে কষ্টে বুকের ভেতরটা ডুকরে কেঁদে উঠলো। চোখের কোণে জল চলে এলো। রুমালটা বের করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে মুছে নিলাম।

হায়রে জীবন! কোথাও তুমি পাঁচ তলার রাজপ্রাসাদে আনন্দের মুর্ছনায় দিন কাটাও, আবার কোথাও এই বস্তির ভাঙা চাটাইয়ের মধ্যে ধুঁকে ধুঁকে মরো।

ঐটুকু সময়ের জন্য আমার পৃথিবীটা যেন ধোঁয়াশায় ঢেকে গেল। মনে মনে বললাম সব দিয়েও  এদের মুখে যদি একটু হাসি ফুটাতে পারতাম তাহলে হয়তো ঈশ্বরকেও  ক্ষণিকের জন্য খুশি করতে পারতাম।

মানিব্যাগের পকেট থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে ছেলেটার হাতে দিয়ে বললাম সন্ধ্যায় ঐ চায়ের দোকানে আয়। দেখি সবার সাথে আলোচনা করে কতটুকু করতে পারি।

এই বলে বেরিয়ে এলাম।

আসতে আসতে ভাবলাম আমরা যারা শিক্ষিত হয়েছি, অনেক অনেক বড় চাকরি করছি, অনেক অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছি তারা বাবা-মা কে কত কষ্ট দিচ্ছি, বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাচ্ছি। অথচ ঐটুকু শিশু, দুঃখী অসহায় এতিম বাচ্ছা কিভাবে মায়ের সেবা যত্ন করে চলেছে।

হে ঈশ্বর তুমি এদের পাশে একটু থাক না কেন?


Copyright © Arun Barmon

Comments