ছোটগল্প : অন্তর মহল
💞 অন্তর মহল 💞
কলমে_ ✍️ চন্দনা ভৌমিক (মিষ্টি)
" তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মন রে আমার "
পড়ন্ত বিকেলে ব্যালকনি তে বসে হেডফোনে গান শুনছে সুলগ্না। মনের আনন্দ দুঃখ যাই হোক না কেনো গানই প্রিয় সঙ্গী ওর। এই নিয়মের নড়চড় হয়নি আজও। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া এখন আর কিছু ভাবতে পারে না, কিন্তু এই রবীন্দ্র সংগীত কে একসময় একদম পছন্দ করতো না ও। সেই যে মানুষটার প্রেমে পড়েছিলো তারপর থেকে আমূল বদলে গেছিলো ওর জীবনের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, পছন্দ, অপছন্দ সব। পাশ্চাত্য ধ্যান ধারণায় বিশ্বাসী মেয়েটি হঠাৎ করেই মাটির গন্ধ পেতে শুরু করেছিলো। কলেজের সান্ধ্য অনুষ্ঠান, ইস্টার্ন ওয়েস্টার্ন মিউজিকের কম্পিটিশন, নতুন একটি ছেলের সঙ্গে এক ঝলক দৃষ্টি বিনিময়, তারপর বন্ধুদের ইয়ার্কি মস্করার মাঝে কখন যে একটি মন ওপর একটি মনের দুয়ারে কড়া নাড়তে শুরু করেছিলো সেটা বুঝি বোঝেনি তারা নিজেরাও। বান্ধবীদের কাছ থেকে সুলগ্না জেনেছিলো ছেলেটির নাম অনিশ। বেশ ভালো লেগেছিলো নাম টা। মনে মনে ভেবেছিলো মন্দ নয়। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ও খেলেছিলো নিজের অজান্তেই। মনের জোয়ারে প্রেমের মাতামাতি নিশ্চিত হয়েছিলো সেদিন যেদিন সুলগ্না জানতে পেরেছিলো অনিশের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। হসপিটালে অ্যাডমিট, সিরিয়াস। ছুট্টে গিয়েছিলো হসপিটালে। সারারাত জেগে প্রার্থনা করেছে ওর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার। অনিশের সাথে সাথে তখন সুলগ্নারও ঘর বাড়ী হয়ে উঠেছিলো হসপিটাল চত্বর। অনিশের বাবা মায়ের সাথে আলাপ ও হয়ে গেছিলো এভাবেই। সুলগ্না অনিশের হাত ধরে শুধু একবার বলেছিলো_
" কথা দাও এমন অসতর্ক আর কখনও হবে না।"
উত্তর পেয়েছিল _
" এই জীবনে আর হবো না। কথা দিলাম। "
দুই পক্ষের বাবা মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে সানাই বেজেছিল শীঘ্রই। বিয়ে, হানিমুন সব মিলিয়ে স্বপ্নের মতো কাটছিলো প্রতিটি দিন। নতুন ঘর, নতুন সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ হচ্ছিলো দুটি শরীর, দুটি মন। রবীন্দ্র সংগীত, বাউল, ভাটিয়ালী গানের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে। অনিশ ঘরে না থাকলেই গান আর হেডফোন ওর সঙ্গী হতো। অনিশ মাঝে মাঝে ওকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য লুকিয়ে রাখতো হেডফোন টা। খুঁজে খুঁজে না পেয়ে রেগেমেগে জিজ্ঞাসা করতো_
" কোথায় রেখেছো আমার হেডফোন? দাও দাও বলছি। না হলে কিন্তু আমি কথা বলবো না তোমার সাথে... বলে দিলাম।"
অনিশ ওর রাগ ভাঙিয়ে বলতো_
" কানদুটো এবার খারাপ হয়ে যাবে। সবসময় হেডফোন পরার কি দরকার? এমনি গান শোনো। সারা ঘর গমগম করবে। এতো সুন্দর মিউজিক সিস্টেম এনে দিলাম যে.... তবুও তুমি যে কি..."
সুলগ্না বলতো_
" ও তুমি বুঝবে না। সিস্টেমে তুমি শোনো। হেডফোন লাগিয়ে গান শোনার মজাই আলাদা। পুরো বুকে বাজে রবি ঠাকুর। বুঝলে?"
সুখ, শান্তি, ভালোবাসার স্বর্গে হঠাৎই নেমে এসেছিলো করাল গ্রাস। সেদিন অফিস থেকে শরীর খারাপ নিয়েই বাড়ী ফিরেছিল অনিশ। সামান্য জ্বর, সর্দি, কাশি এ আর এমন কি? ডাক্তার, টেস্ট, ওষুধ সবই চললো কিন্তু সাত দিনের মাথায় ভেন্টিলেশন তারপর সব স্তব্ধ। সুলগ্নার বাবা মা , শ্বশুর শাশুড়ি সকলেই চেয়েছিলেন ওকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে। কিন্তু মন চায় নি যেতে। ভালোবাসার আদরে মোড়া বাড়িটার কোনায় কোনায় যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে ওদের প্রেমের সাক্ষী। অনিশকে এই বাড়িটায় একা ছেড়ে মন চাই নি অন্য কোথাও যেতে। এখন শুধুই অনিশের প্রিয় গানগুলো শোনে সুলগ্না। হেডফোন টা আজও ওর সঙ্গী। কোনো কোনো দিন গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়েও পড়ে।
"উফফ তোমায় নিয়ে আর পারি না। হেডফোন টা পরেই ঘুমিয়ে গেছো? দেখি দেখি খোলো। এবার সত্যিই কিন্তু কান টা খারাপ হবে। সেই সঙ্গে মাথা টাও। তখন কি করবো আমি? চাদর টাও গায়ে দাও নি ঠিক করে? নতুন ঠাণ্ডা পড়ছে তো... জ্বর বাধাবে দেখছি। দেখি দেখি.... "
" কে? কে? অনি এলে বুঝি? জানতাম ঠিক আসবে তুমি... পারবেই না আমাকে ছেড়ে থাকতে। আর কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে না বলো.... কথা দাও... কথা দাও যাবে না..."
" ও বৌদি... কি গো? ওঠো...ওঠো... এই নাও চা এনেছি। খাও দেখি... গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গেছিলে নাকি? চাদর টা গায়ে দাও। ঠাণ্ডা পড়ছে। ঘরে চলো.. চলো ওঠো.... "
@ মিষ্টি ✍️
© All copyrights reserved for## Mishti##

Comments
Post a Comment