গল্প : ফুটপাতের আত্মকথা

 



#বিভাগ_আত্মকথা 

#শিরোনাম _ফুটপাতের আত্মকথা

#✍🏽সৌগত মুখোপাধ্যায়


*পথিক তুমি কি পথ হারিয়েছো* না প্রশ্নটা এরকম ছিলো না,সারাদিন ১৪ বছরের স্বপ্ন এক করা কিছু কাগজের ফাইলটা হাতে নিয়ে একটা চাকরীর আশায় অফিস পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি।তপ্ত দুপুরে স্বপ্ন ভঙ্গ মনটা আর শরীরের সঙ্গে চলতে চাইছিলো না।দাঁড়িয়ে পড়ি একটা আমারই মতো ফুটপাতের ধারে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আধমরা যৌবনের পলাশ গাছের তলায় সিমেন্টের বিশ্রাম নেবার ভাঙা চেয়ারটার সামনে।একটা ফিস ফিস হাওয়া কানের কাছে বলে *খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা,একটু বোস জিরিয়ে নে* এই বলে সেই হাওয়া চিয়ারের ধূলো উড়িয়ে দিয়ে যায়।আমি বসে পরি, ক্লান্ত রাস্তার তপ্ত নিঃশ্বাস আগুনের হল্কা র মতো আমাকে ছুঁয়ে যায়।আবার সেই ফিস ফিসে কথা,তোরা এলে আমার খুব আনন্দ হয়রে বাবা,আমার তো কেউ নেই তোরা ছাড়া,চিন্তা করিস না বাপধন তোর স্বপ্ন পূর্ণ একদিন হবেই,ভেঙে পড়তে নেই একদম ভেঙে পরিস না।মনের ভিতরটা প্রশ্ন করে ওঠে কে তুমি?তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেনো।

  সেই ফিস ফিসে আওয়াজ এবার পরিষ্কার হয়" আমি তো তোর সামনেই বাপ,আমি তো এই ফুটপাত।শুনবি আমার কথা তবে শোন।

   বহু বছর আগে এই রাস্তাটা তখন মাটির,আমার তখন জন্ম হয়নি।মানুষের খুব কষ্ট হতো হাঁটা চলার,তারপর একদিন বেশ চওড়া করে বাঁধানো হলো ইঁট দিয়ে।তার দুপাশে জন্ম নিলাম আমি মাটি আঁকড়ে, নগ্ন প্রায় শরীর নিয়ে পড়ে থাকতাম দুপাড়ে।কুকুর বেড়াল বিষ্ঠা ত্যাগ করে দুর্গন্ধে ভরিয়ে রাখতো আমার শরীর।সময় বদলালো রাস্তা পিচের পোশাক পেলো আমি শুধু দেখলাম যেমন ছিলাম তেমনি রয়ে গেলাম।বর্ষায় সিক্ত হয়ে সারা শরীরে ক্ষয় রোগ নিয়ে যন্ত্রনায় কাতরে মড়তাম কেউ শুনতো না।একদিন একটা অঘটন ঘটে গেলো, বিশ্বাস কর বাবা আমি এভাবে বাঁচতে চাইনি।একটা বাচ্ছা ছেলে বর্ষার দিন স্কুলে যাচ্ছিল রাস্তা ধরে হটাৎ পিছন থেকে একটা গাড়ি এসে তাকে ধাক্কা মারলো,রক্তাক্ত শরীরটা কুণ্ডুলি পাকিয়ে আমার দগ দগদে ঘায়ে ভরা শরীরে ছটপট করতে করতে নিথর হয়ে গেলো।আমার সারা শরীর তার রক্তে রাঙা হয়ে উঠলো।আমি বুক ফাটা কান্নায় আর্তনাদ করতে থাকলাম'ওগো কেউ শুনছো,একে তোমরা বাঁচাও বাঁচাও'

    বর্ষা গেলো রক্তের দাগ কাদার বুকে মিলিয়ে গেলো।এবার সবাই আমার গায়ে পোশাক পড়ালো, ওই বাচ্ছাটার রক্তে আমার সংস্কার হলো ,নব জন্ম নিলাম আমি আজকের ফুটপাত।

   আমার যত্ন কয়েকদিন বেশ হলো,আমার রূপের প্রশংসা হলো।আমি পথ চলতি মানুষকে বুকে নিয়ে মহানন্দে দিন কাটাতে লাগলাম।সুখ বেশি দিন রইলো না।রাস্তা সারাইয়ের গাইতির ঘায়ে আমি ক্ষতবিক্ষত হতে লাগলাম।আবার শরীর জুড়ে বিষাক্ত ক্ষতর সৃষ্টি হলো।মানুষজন রাস্তায় নেমে পড়লো।তাঁদের মুখের পান,গুটখার পিচে আমার সারা শরীর মেখে উঠলো,গা রি রি করে উঠতো কিন্তু আমার কষ্টের কথা ওদের কানে পৌঁছুল না।আমি পরিত্যক্ত হতে শুরু করলাম।এখন দিনের আলোয় আমার ভয় লাগে,আবার কোন যন্ত্রণার সামনে করতে হবে আমাকে।রাত এখন আমার খুব প্রীয়।রাতের আঁধারে যখন সবাই ঘুমিয়ে পরে তখন গৃহহীন অর্ধভুক্ত মানুষ গুলো আমার কোলে আশ্রয় নেয়,ওঁদের মাথায় হাত বুলিয়ে আমি ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়ে নিজের দুঃখ ভুলি।কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা কুকুর গুলো যখন আবদারের সুরে ভৌ শব্দ তোলে আমি ওদের ধমক দিয়ে বলি,ঘুমো চুপ করে ঘুমো এখন তোদের কেউ মারবে না বকবে না একটু শান্তিতে ঘুমো।

    একমনে আমি শুনছিলাম ফুটপাতের কথা,হটাৎ একটা গাড়ি এসে আমার সামনে পার্ক করলো,দুটো ছেলে সেখান থেকে নেমে ফুটপাতের সাইডে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে লাগলো।ওরা মদ্যপ তীব্র প্রস্রাবের গন্ধে আমার নাক ঝাঁঝিয়ে উঠলো।ছেলেগুলো অবশিষ্ট মদ নিয়ে আমার পাশে বসলো।আমি উঠে পড়লাম ,পকেট থেকে একটা কয়েন ফুটপাতে পরে যেতেই আমি সেটা কুড়োতে হাত বাড়ালাম একটা অদৃশ্য হাত আমার হাতটা চেপে যেনো বললো,আবার আসিস আর পারলে আমার কথা সবাইকে বলিস ওরা যেনো আমাকে আর কষ্ট না দেয়,আর আমাকে নোংরা না করে,আমি আরো কিছুদিন তোদের সঙ্গে থাকতে চাই।বলিস বাপধন আমার কথা বলিস।

     🙏🙏🙏🙏🙏

কপিরাইট রিজার্ভ @সৌগত@মুখোপাধ্যায়#২০২১

Comments