ছোটগল্প : আদর্শ শিক্ষক
ছোট গল্প
আদর্শ শিক্ষক
কলমে~নাবজীবন ছত্রধর।
১২/০৭/২০২১
~~~~~~~~~~~~~~~
আজ ছাত্র জীবনের কথা খুব মনে পড়ছে,মনে পড়ছে সেই ডানপিটেপনার কথা।
কত খেলাধুলা, পড়াশুনা,মারামারি, মাস্টার মহাশয়ের হাতে মার খাওয়া আরও কত রকম কত কি।
আমার স্কুল জীবনের একটি ঘটনা বেশ মনে আছে, ভালো পড়াশুনা করতাম বলে মাস্টার মহাশয় আমাকে খুব ভালো বাসতো।
জানি না একদিন কি মতিভ্ৰম হলো,পেরেকে ঝোলানো মাস্টার মহাশয়ের জামার পকেট থেকে দশ টাকার নোট একটা আমি চুরি করে নিয়েছিলাম।
চকোলেট খাওয়ার খুব লোভ ছিলো আমার,স্কুল ছুটির পর চকলেট কিনে নিয়ে খেতে খেতে মুখে রস চুক চুক করতে করতে বাড়ি যাবো, এই ভেবে টাকাটা দড়ি দেওয়া প্যান্টের দড়ির ঘরে কেতিয়ে
কেতিয়ে ঢুকিয়ে দিলাম।
টিফিনের সময় শেষ, ঘন্টা বেজে উঠলো, আমরা সবাই ক্লাস রুমে গিয়ে বসলাম।
হেড মাস্টার মহাশয়ের ক্লাস, স্যার খুব হাসি খুশি,গল্প, গান, নাটক,কবিতায় দারুণ দক্ষ মানুষটা.
স্যার আসছেন, আজ স্যারের মুখে হাসি নাই,কেমন যেন একটা গম্ভীর প্রকৃতির মনে হচ্ছে।
আমার বুকটা ধক করে উঠলো,তবে কি মাস্টার মহাশয়ের দশ টাকা চুরি গেছে জানতে পেরেছেন?!
আর চুরিটা যেহেতু আমি করেছি তাই বুকের মধ্যে একটা দুরন্ত ভয় কাজ করছে,তবু গলাটা সরিয়ে নিজেকে একদম নির্দোষী বানানোর বৃথা চেষ্টা করে গেলাম।
স্যার ক্লাসে ঢুকতেই সবার থেকে জোরে চিৎকার করে বললাম "গুড আফটারনুন স্যার"! তবুও নিজেকে ঠিক করতে পারলাম না। এমনই একটা মানসিক অস্থিরতা যখন চলছিলো আমার,ঠিক তখনই স্যার একটু মৃদু হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
~আজ চোর পুলিশ খেলা হবে।
আঁতকে উঠলাম আমি,স্যার হঠাৎ একথা বলছে কেন,তবে কি স্যার আমাকেই......
ভাবনাটা শেষ হলোনা স্যার বললেন..
~আজকের শুধু একজন পুলিশ-ই খেলবে।
সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ক্লাসের ডানপিটে একটা ছেলে হাত তুললো..
~স্যার আমি পুলিশ হবো.....
~ঠিক আছে তবে পেছনের ব্রেঞ্চ থেকে এক একজনকে সার্চ করে দেখো,একটা চুরি যাওয়া দশ টাকার নোট কার কাছে পাওয়া যায়।
আমার গা দিয়ে তির তির করে ঘাম ঝরছে,দুটো পা থর থর করে কাঁপছে, আমার কাছে টাকাটা রয়েছে, ধরা নির্ঘাত পড়বোই।
শুরু হয়ে গেছে পরীক্ষা,একের পর এক সবাইকে ভালো করে দেখে নিচ্ছে পুলিশ সাজা ছেলেটা।
এবার আমার পালা,দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার,এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম।নিয়ম অনুযায়ী ভয়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করে হাত তুললাম
হঠাৎ হেড স্যার পুলিশের উদ্দেশ্যে বললো...
~এইযে আপনার দ্বারা আর চোর ধরা হবে না,এখন আমি পুলিশ,নতুন অফিসার আমি,কেস টা আমি হাতে নিচ্ছি,আপনি বসুন।
পুলিশ সাজা ছেলেটা বসে পড়লো, স্যার পুলিশ আমার দিকে এগিয়ে এলো, চোখ বন্ধ করতেই আমার গায়ে হাত দিলো স্যার,তখন আমি তাল পাতার মতো কাঁপছি, উপরের জামার পকেট সার্চ করে নিচের দড়ি দেওয়া প্যান্ট টা পরীক্ষা করতে গিয়ে স্যার টাকাটা খুঁজে পেলো, এই বুঝি চোর চোর বলে সবাই চিৎকার করে উঠলো.....
কিন্তু কি অদ্ভুত, স্যার ইচ্ছে করেই আমার কাছ থেকে সরে গিয়ে অন্য ছেলেদের কাছে চলে গেলো।
সবাইর পরীক্ষা শেষ হলো
~না! আজকে চোর ধরা গেলো না।যাও আজকের মতো ছুটি।
সবাই হই হই করে বেরিয়ে গেলো, আমি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বেরিয়ে যাবো এমন সময়..
~পলাশ তুমি একটু অফিসে এসো।
কথাটা বলে মাস্টার মশাই অফিসে গেলেন।
আমি এবার আরও ভয় পেয়ে গেলাম,হৃদস্পন্ধন শুরু হলো,ভয়ে ভয়ে অফিসে ঢুকলাম।
দেখি একটা লাঠি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাস্টার মশাই, আমি ভাবলাম এবার আর আমার উপায় নেই বাঁচার। শাস্তি আমাকে পেতেই হবে।
আমি দেরি না করে দশ টাকা বার করে টেবিলে রাখলাম।
কিছুই বলতে পারলাম না,স্যার যেন আরও গম্ভীর হয়ে গেলো, আমার দিকে এগিয়ে এলো,
এবার আর আমার উপায় নেই,পিঠে এবার লাঠি ভাঙবে।চোখ বন্ধ করে দিলাম।
কি অদ্ভুত স্যার হঠাৎ আমার হাতে লাঠিটা দিয়ে বললো..
~পলাশ এই লাঠি দিয়ে আমাকে তুই ইচ্ছে মতো মার,
বলেই মাস্টার মশাই তাঁর জামা গেঞ্জি সব খুলে দিয়ে...
~মার পলাশ মার,জোরে জোরে মেরে আমার পিঠে দাগ বসিয়ে দে। এতদিনেও তোকে আমি উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারি নি, সব দোষটা আমার।
তাই শাস্তিটা আমার প্রাপ্য।
আমার হাত দুটো কাঁপছে,চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে..
এমন মহান মানুষ এমন মহৎ যার হৃদয়,আমি তাঁর মনে কত আঘাত দিয়েছি।এক মুহূর্ত দেরি করলাম না হেড স্যারের দুটো পা জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলাম...
~মাস্টার মশাই,আমি আর কোনো দিন চুরি করবো না, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।
স্যার আমাকে পরম মমতায় আমাকে পায়ের নিচ থেকে উঠালো, দেখছি মাস্টার মশাইয়ের দু-গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে, আমি মন্ত্রমুগ্ধর মতো মাস্টার মহাশয়ের চোখের জল মোছাতে মোছাতে....
~মাস্টার মশাই আমি আর জীবনে এমন কাজ করবো না মাস্টার মশাই।
~ওরে পলাশ তোকে যে আমি সবার চাইতে বেশি ভালোবাসি রে ভালোবাসি।
কথাটা বলে আমাকে মাস্টার মশাই বুকে জড়িয়ে ধরলেন। নীরবে নি:শব্দে ছাত্র শিক্ষকের সেই যুগল মিলন দেখেছিলো অফিসের দেওয়ালে টাঙানো বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের ছবিটা।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

Comments
Post a Comment